আটলান্টিক মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ স্রোতব্যবস্থা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে। নতুন গবেষণা বলছে, এটি অবসান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের যে মডেলগুলো স্রোতের গতি ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, গবেষণায় সেগুলোই এখন আরও বেশি বাস্তবসম্মত বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এই ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এই স্রোত থমকে গেলে ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (আমক) হলো পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণকারী একটি প্রধান ব্যবস্থা। এটি বিশ্বজুড়ে উষ্ণ ও শীতল পানি প্রবাহিত করে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। জলবায়ু সংকটের কারণে এটি এরই মধ্যে গত ১ হাজার ৬০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ২০২১ সালে বিজ্ঞানীরা এর বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছানোর প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করেছিলেন। অতীতে পৃথিবীতে এই স্রোত ভেঙে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ভবিষ্যতের জলবায়ু বুঝতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেন। কিন্তু এই জটিল ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এসব মডেলের ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন। কিছু মডেল বলছে, ২১০০ সালের মধ্যে এটি আর ধীর হবে না। আবার কিছু মডেল বলছে, এটি প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ধীর হয়ে যেতে পারে। এমনকি জীবাশ্ম জ্বালানি কমিয়ে শূন্যে নামালেও এই ধীরগতি হতে পারে।
নতুন এই গবেষণায় বাস্তব সমুদ্র পর্যবেক্ষণের তথ্যের সঙ্গে মডেলগুলো মিলিয়ে দেখা হয়েছে। এতে অনিশ্চয়তা অনেক কমে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, ২১০০ সালের মধ্যে এই স্রোত ৪২ শতাংশ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। গতির এই হ্রাস পাওয়া মানেই হলো এই স্রোতব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এই আমক স্রোত উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের গরম পানি ইউরোপ ও সুমেরু অঞ্চলে নিয়ে যায়। সেখানে পানি ঠাণ্ডা হয়ে নিচে নেমে যায় এবং ফিরতি পথে গভীর স্রোত তৈরি করে। এই প্রক্রিয়া বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়লে উষ্ণমণ্ডলীয় বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে, যার ওপর লাখ লাখ মানুষের খাদ্য উৎপাদন নির্ভরশীল। এর ফলে পশ্চিম ইউরোপে চরম শীত ও গ্রীষ্মকালীন খরা দেখা দেবে। পাশাপাশি আটলান্টিক উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৫০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার বেড়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনরিয়ার বিজ্ঞানী ডক্টর ভ্যালেন্টিন পোর্টম্যান এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, আমক আগের ধারণার তুলনায় বেশি দুর্বল হবে। এর মানে এটি এখন বিপজ্জনক সীমার আরও কাছাকাছি।’
জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক স্টেফান রাহমস্টর্ফ এই ফলাফলকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘যেসব মডেল এই স্রোতের ভয়াবহ দুর্বলতা দেখিয়েছিল, দুঃখজনকভাবে সেগুলোই এখন বাস্তব হিসেবে ধরা দিচ্ছে।’
গত ৩৫ বছর ধরে এই স্রোত নিয়ে গবেষণা করা রাহমস্টর্ফ আশঙ্কা করছেন, চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝিতেই আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাব যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘আগে যখন এর পতনের ঝুঁকি ৫ শতাংশ ছিল, তখনই আমরা একে বিপজ্জনক বলেছিলাম। এখন এই ঝুঁকি ৫০ শতাংশের বেশি। গত ১ লাখ বছরে পৃথিবীতে যত বড় বড় জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে, তার মূলে ছিল এই আটলান্টিক স্রোতের পরিবর্তন।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আর্কটিক অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে সমুদ্রের পানি আগের মতো দ্রুত ঠাণ্ডা হচ্ছে না। গরম পানি কম ঘন হওয়ায় এটি ধীরে নিচে নামে। এতে উপরিভাগে বেশি বৃষ্টির পানি জমা হয়, যা পানির ঘনত্ব আরও কমায়। ফলে নিচে নামার গতি আরও কমে গিয়ে একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৈরি হয়, যা আমককে আরও দুর্বল করে।
এই ব্যবস্থা খুবই জটিল ও প্রাকৃতিকভাবে নানা পরিবর্তনের শিকার। তাই সঠিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। তবে বিজ্ঞানীরা এখন বড় ধরনের দুর্বলতা আসার সম্ভাবনা দেখছেন, যা আগামী কয়েক দশকে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বাস্তব তথ্য দিয়ে মডেল যাচাইয়ের চারটি পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘রিজ রিগ্রেশন’ পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো ফল দিয়েছে, যা আগে জলবায়ু গবেষণায় খুব কম ব্যবহার করা হয়েছে।
আমককে মডেল করা কঠিন, কারণ এটি আটলান্টিক জুড়ে পানির ঘনত্বের সূক্ষ্ম পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। এই পার্থক্য তৈরি হয় মূলত লবণাক্ততার পরিবর্তনের কারণে। নতুন বিশ্লেষণে এমন মডেল শনাক্ত করা হয়েছে, যা দক্ষিণ আটলান্টিকের পৃষ্ঠের লবণাক্ততা ভালোভাবে তুলে ধরে। এ কারণে গবেষণাটি ‘খুবই বিশ্বাসযোগ্য’ বলে মত দেন রাহমস্টর্ফ।
তিনি আরও বলেন, ‘২১০০ সালে আমকের ধীরগতি নতুন এই হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ মডেলগুলো গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার পানিকে হিসাবের মধ্যে নেয় না। এই পানি সমুদ্রের লবণাক্ততা কমিয়ে দেয়।’ তার মতে, বাস্তব পরিস্থিতি সম্ভবত আরও খারাপ হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান