বিশ্বের দুটি স্থানে ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত হয়েছে। ওই দুটি স্থানের মধ্যে রয়েছে গাজা উপত্যকার কিছু এলাকা ও সুদান। ২০২৬ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিসেস (জিআরএফসি) অনুযায়ী, দুর্ভিক্ষসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন চালুর পর এবারই প্রথম দুটি স্থানে এমন পরিস্থিতি নিশ্চিত হলো।
১৮টি মানবিক ও উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়ে তৈরি এই বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে তীব্র খাদ্যসংকট বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান ছিল। খাদ্যসংকটে থাকা ৪৭টি দেশ ও অঞ্চলে মোট জনসংখ্যার ২২ দশমিক ৯ শতাংশ, প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ, গত বছর তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগেছে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ২০১৬ সালে ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
২০২০ সাল থেকে বিশ্লেষণ করা জনসংখ্যার মধ্যে তীব্র ক্ষুধার হার প্রতিবছরই ২০ শতাংশের ওপর রয়েছে। মোট সংখ্যার দিক থেকে ২০১৬ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৫৭ লাখে। ২০২৩ সালে এটি সর্বোচ্চ ২৮ কোটি ১৬ লাখে পৌঁছেছিল।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় সামান্য কম সংখ্যা দেখা গেলেও এর মূল কারণ হলো বিশ্লেষণ করা দেশের সংখ্যা কমে যাওয়া, ৫৩ থেকে ৪৭-এ নেমে এসেছে। বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
দুর্ভিক্ষ, বিপর্যয় ও জরুরি অবস্থা
আইপিসি (ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন) পদ্ধতির সর্বোচ্চ স্তর ‘দুর্ভিক্ষ’ ২০২৫ সালে গাজার কিছু অংশ ও সুদানে নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া গাজা, সুদান ও দক্ষিণ সুদানের আরও কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি রয়ে গেছে, যা ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকতে পারে।
আইপিসি অনুযায়ী, দুর্ভিক্ষ ঘোষণার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়। সেগুলো হলো অন্তত ২০ শতাংশ পরিবারকে চরম খাদ্যসংকটে থাকতে হবে, জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে হবে, প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত ২ জনের মৃত্যু হতে হবে।
অনাহার বা সংশ্লিষ্ট কারণে ছয়টি দেশ ও অঞ্চলে ‘বিপর্যয়কর’ বা ফেজ-৫ পরিস্থিতিতে মানুষ রয়েছে, যা আইপিসির সর্বোচ্চ স্তর। এ সংখ্যা ১৪ লাখে পৌঁছেছে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় ৯ গুণের বেশি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গাজা উপত্যকা, যেখানে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৭০০ মানুষ, মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে রয়েছে। এর পরেই রয়েছে সুদান, যেখানে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ মানুষ, মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ এ অবস্থায় রয়েছে।
এ ছাড়া আরও চারটি দেশে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে গুরুতর খাদ্যসংকট দেখা গেছে। দক্ষিণ সুদানে ৮৩ হাজার ৫০০ (জনসংখ্যার ১ শতাংশ), ইয়েমেনে ৪১ হাজার ২০০ (০.১ শতাংশ), হাইতিতে ৮ হাজার ৪০০ (০.১ শতাংশ), মালিতে ২ হাজার ৬০০ (০.০১ শতাংশ)।
এ ছাড়া ৩২টি দেশে ৩ কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষ ফেজ-৪ বা ‘জরুরি’ অবস্থায় রয়েছে, যা মোট বিশ্লেষিত জনসংখ্যার তুলনায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
সংঘাত ও সহিংসতা ১৯টি দেশে তীব্র খাদ্যসংকটের প্রধান কারণ, যেখানে ১৪ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বৈশ্বিক ক্ষুধার্ত মানুষের অর্ধেকেরও বেশি। আবহাওয়ার চরম পরিস্থিতি ১৬টি দেশে ৮ কোটি ৭৫ লাখ মানুষের খাদ্যসংকটের মূল কারণ, আর অর্থনৈতিক ধাক্কা ১২টি দেশে ২ কোটি ৯৮ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করেছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৫ সালে খাদ্যসংকট মোকাবিলায় মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তার অর্থায়ন কমে গেছে, যা ২০১৬-১৭ সালের পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, অনেক জায়গায় পরিস্থিতি এখনো গুরুতর। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্যবাজারে সরাসরি ও পরোক্ষ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
২০২৫ সালে ২৩টি দেশে পুষ্টিসংকটে থাকা প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত, যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। এ ছাড়া ২ কোটি ৫৭ লাখ শিশু মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগেছে। ২১টি দেশে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৯২ লাখ গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীও তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন।
খাদ্যসংকটপূর্ণ দেশগুলোতেই বাস্তুচ্যুতি বেশি
২০২৫ সালে ৪৬টি দেশে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৫১ লাখে। এর মধ্যে ৩৪টি দেশে ৬ কোটি ২৬ লাখ মানুষ নিজ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত, আর ৪৪টি দেশে ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষ শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে রয়েছে।
প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, ক্ষুধার মূল কাঠামোগত কারণগুলো সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নিলে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলো ২০২৬ সালেও বৈশ্বিক ক্ষুধার ভার বহন করতে থাকবে। সূত্র: আল-জাজিরা