স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে ২৪ জুলাই আন্দোলন পর্যন্ত সকল আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে ছিলেন রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীরা। কিন্তু দল ক্ষমতায় এলে তারা কোনো কাঙ্খিত পদ পান না বা দেওয়া হয় না সরকারের পক্ষ থেকে বা দলের পক্ষ থেকে। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ থাকে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার নেতাকর্মী এবং এলাকাবাসীর মাঝে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে সিদ্ধিরগঞ্জ পেয়েছে মাত্র একবার এমপি পদ, একবার শাখা সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতির পদ ও একবার জেলা পরিষদের প্রশাসকের পদ। এছাড়া কাঙ্খিত এবং উল্লেখ করার মতো এ এলাকার নেতারা কোনো পদ পায়নি।
সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপি নেতাদের কোনো একজনকে থেকে এমপি পদে নির্বচনের জন্য নমিনেশন পাওয়ার প্রত্যাশায় ছিল সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীরা। কিন্তু এবারও বঞ্চিত করা হয়েছিল তাদেরকে। বিএনপি বা জামায়াত ইসলাম থেকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছিল সোনারগাঁয়ের আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং জামায়াতের ইকবাল হোসেনকে।
স্বাধীনতার পর থেকে ডেমরার সুলতানা কামাল সেতু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলের ১৮টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম ছিল সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় বা চিটাগাংরোড বাসস্টান্ড এলাকা। যাকে কাঁচপুর সেতুর মাধ্যমে বন্ধন সৃষ্টি করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিরোধী দলের রাজনীতি এ শিমরাইল মোড়কেন্দ্রীক অনেকটা ছিল। কেননা এ রাস্তা বন্ধ করে দিলে পূর্বাঞ্চলের ১৮টি জেলার সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকত। তাই সিদ্ধিরগঞ্জের বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা বরাবরই প্রতিটি সরকারের কাছে মাথা ব্যাথার ও ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়াতো।
এ শিমরাইল মোড় অনেক আন্দোল সংগ্রামের স্বাক্ষী। তাছাড়া এ এলাকায় ছিলো এশিয়ার বৃহত্তম আদমজী জুট মিল। যার শ্রমিক ঢাকা শহরে না গেলে ঢাকার জনাসমাবেশগুলো অর্ধেকও পূর্ণ হতো না। এছাড়াও এ সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী ইপিজেড, বিমানের একমাত্র জেট ফুয়েল (জেট-এ-ওয়ান) সরবরাহের ডিপো পদ্মা এবং অন্যান্য তেলের ডিপো মেঘনা অয়েল ডিপো, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ছাড়াও ছোট-বড় অনেক মিল কারখানা রয়েছে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
বিএনপি, আওয়ামীলগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মতে, অর্থনীতি ও জাতীয় রাজনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখা সিদ্ধিরগঞ্জের দিকে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃবর্গ বরারবই ছিল উদাসীন। সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীদের অনেক ত্যাগ, ঘাম ঝরানো ও রক্ত বিসর্জন দেওয়ার পরও ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নিজ দলের সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাদের কথা ভুলে যান।
তারা বলেন, স্বাধীনতার পর সিদ্ধিরগঞ্জ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে শুধু গিয়াস উদ্দিন এমপি পদ পেয়েছেন। এছাড়া আব্দুল মতিন মাস্টারকে জাতীয় শ্রমিকলীগের সভাপতি করা হয়েছিল। এ পদে তিনি ২০০৩ সালের জুলাইয়ের ৩ তারিখ থেকে ২০১২ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত ছিলেন। সভাপতি হিসাবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আব্দুল মতিন মাস্টার। ওয়ান ইলেভেনের পর ‘রব উঠে’ তাকে এমপি করা হবে। কিন্তু তাকে দল নমিনেশন না দিয়ে সোনারগাঁয়ের কায়সার হাসনাতকে নমিনেশন দিলে কায়সার হাসনাত এমপি হন। এমপি পদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন আব্দুল মতিন মাস্টার তথা সিদ্ধিরগঞ্জ। আর এবার অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে করা হয়েছে জেলা পরিষদের প্রশাসক।
এছাড়া তিন রজানৈতিক দলের কোনোটিই ক্ষমতায় আসলে বা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে উল্লেখ করার মতো সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাদরেকে তেমন মূল্যয়ন করা হয়নি উল্লেখযোগ্য কোনো পদ দিয়ে।
এ ব্যাপারে জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি ও সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা প্রবীণ রাজনীতিবিদ আব্দুল মতিন মাস্টার জানায়, দলগুলো আমাদেরকে অনেক বঞ্চিত করেছে। আমাদের সিদ্ধিরগঞ্জ আন্দোলন এবং রাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হওয়াসত্বেও সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকার আন্দোলন সংগ্রামে গিয়ে আন্দোলনগুলোকে বেগবান করার পরও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাদের সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাদেরকে তেমন পদ-পদবী দেয়নি। এতে করে এক সময় হয়তো ভাল ছেলেরা রাজনীতিতে না আসার শঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা অধ্যাপক মামুন মাহমুদ জানায়, সিদ্ধিরগঞ্জের যোগ্যব্যক্তিদের আরো পদ দেওয়া প্রয়োজন ছিল। জাতীয় পর্যায়ের যারা নীতিনির্ধারক তারা সুষম বিন্যাশ বা বন্টন করে সিদ্ধিরগঞ্জকে প্রায়োরিটি দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যেহেতু জাতীয় আন্দোলনগুলোতে সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীরা অনেক ভূমিকা রাখে, সেই প্রেক্ষিতে জাতীয় নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব সিদ্ধিরগঞ্জের রাজনৈতিক নেতাদের যথাযথ পদ-পদবী দিয়ে মূল্যায়ন করা। যেহেতু স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও তেমন পদ সিদ্ধিরগঞ্জের নেতা পায়নি তাই এইটাকে অবমূল্যায়ন বা মূল্যায়ন না করা বলা যায়।
এ ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার হোসেন খোকন জানায়, এতদিন যা হয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু অন্যদলের কথা আমি বলতে পারব না। তবে আমি মনে করি এখন থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীদেরকে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মূল্যায়ন করবেন। সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা তার মনে অবশ্যই রয়েছে। ইতোমধ্যে আমাদের নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক করেছেন। এমন আগামীতে আরো অনেককে তিনি মূল্যায়িত করবেন বলে আমার বিশ্বাস।