ইরানকে সমর্থনের চেয়ে জ্বালানি ও কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন
- আপডেট সময় : ১২:৫০:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে

ইরানের ওপর ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বেইজিং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও নিজেদের স্বার্থকে সবার আগে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন।
বিশ্লেষকদের মতে, তেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে সহায়তা করার ঝুঁকি নেবে না চীন।
বেইজিং থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বুধবার জানায়, এই জলপথ এখন তাদের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ এবং তারা পারস্য উপ-সাগরজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে।
জ্বালানি তেলের আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশ এই সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের হাতে থাকা বিশাল কৌশলগত মজুত স্বল্পমেয়াদী এই সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করবে। ফলে বেইজিং বর্তমানে অন্যান্য কূটনৈতিক বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
সামনেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩১ মার্চ থেকে এই সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন বিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াং এএফপি’কে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান থেকে চীনে তেল আসা বন্ধ করতে বড় কোনো বাধা তৈরি না করে, তবে ইরান সংকটের কারণে ট্রাম্প-শি বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই।’
তিনি বলেন, ‘বেইজিং ইরানকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে, সামরিক মিত্র হিসেবে নয়। এছাড়া, উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কও চীনকে সরাসরি সামরিক সহায়তা থেকে বিরত রাখছে।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে দীর্ঘদিনের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে মধ্যস্থতা করেছিল বেইজিং।
পরবর্তীতে ইরানকে বেইজিং ও মস্কো নেতৃত্বাধীন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) পূর্ণ সদস্য করা হয়।
নিজ দেশের বিশাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে চীনকে এই অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকতে হয়।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর মতে, চীনের নিজস্ব উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। বাকি বিশাল চাহিদার ঘাটতি মেটানো হয় আমদানিকৃত তেল দিয়ে।
২০২৫ সালে চীনের সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের ৫৭ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার পরিমাণ দৈনিক ৫৯ লাখ ব্যারেল (এমবিডি)। এর মধ্যে ১৪ লাখ ব্যারেল এসেছে ইরান থেকে।
জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলেও চীন যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
কেপলার-এর বিশ্লেষক মুয়ু সু লিখেছেন, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক মজুতের ফলে চীনের কাছে বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল জমা রয়েছে।
এই মজুত চীনের সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের প্রায় ১১৫ দিনের চাহিদার সমান। মুয়ু সু বলেন, ‘বিশাল এই মজুত চীনকে একটি বড় সুরক্ষা দেবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও বা তেলের দাম বাড়লেও চীন ও তাদের রিফাইনারিগুলো অনায়াসেই তা সামলে নিতে পারবে।’
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় গত রোববার চীন ‘তীব্র বিরোধিতা ও কড়া নিন্দা’ জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং চলতি সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং এই সংঘাতকে ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা।’
তিনি আরও জানান, এই সংঘাতে তেহরানে একজন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর অনিচ্ছার কারণে চীন কেবল শক্ত কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর এক প্রতিবেদনে গ্যারেথ লেদার ও মার্ক উইলিয়ামস লিখেছেন, চীনের প্রায় অর্ধেক তেল আমদানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়। তাই এই অঞ্চলে জ্বালানি প্রবাহ সচল রাখা চীনের প্রধান স্বার্থ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়াকে যেভাবে সমর্থন দিয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রে তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো হামলায় সহায়তা করার বিষয়েও চীন অত্যন্ত সতর্ক থাকবে।
কেপলার-এর বিশ্লেষক সু মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকলে রাশিয়া এর সুফল ভোগ করতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারত ও চীনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে রুশ তেলই হবে সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক ভরসা।

















