হাম সন্দেহে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এক মাস তিন দিনে ২১৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ৪০৯ জন। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি। সারা দেশে হঠাৎ কেন হামের এই দুর্যোগ নেমে এলো, এ নিয়ে শঙ্কিত সংশ্লিষ্ট সবাই। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য বিগত দুটি সরকারসহ বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে হাম রোগটিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এমনকি বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদার অনুপাতে হামের টিকা মজুত না থাকাসহ মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকটে কয়েক বছর ধরে সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি। এর জন্য জনবল ঘাটতি ও টিকা কর্মসূচিতে নজরদারিরও অভাব ছিল। টিকা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত কর্মীদের মধ্যে ছিল অসন্তোষ। এছাড়া নিয়মিত বিশেষ টিকার ক্যাম্পেইনও হয়নি। এছাড়া হামের রুটিন টিকা কার্যক্রমে ১০ থেকে ১৫ ভাগ শিশুকে আনা হয়নি টিকার আওতায়। বাদ পড়া শিশুরাই পাঁচ বছর অন্তর বিরাট সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। এসব কারণে মহামারির মতো হাম ছড়িয়ে পড়েছে। ৯ মাসের কম বয়সি শিশু হাম সংক্রমিত হওয়ায় তাদের অভিভাবক-স্বজনের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এজন্য বর্তমান সরকার বিগত দুই সরকারের গাফিলতি ও অদূরদর্শী পরিকল্পনাকে দায়ী করছে। যদিও স্বাস্থ্য খাতের ক্ষত সারাতে বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগও খুব বেশি জোরালো উদ্যোগ নেয়নি বলে মনে করছেন তারা।
হামের প্রাদুর্ভাব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলনে বলেছেন, বিগত দুই সরকারের গাফিলতিতে হাম ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বহু শিশুর মৃত্যু হয়। তিনি জানান, সময়মতো হামের টিকা না দিয়ে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে দুই সরকারই। শিশুমৃত্যুর জন্য তিনি দুঃখপ্রকাশ করেন।
এর আগে ২৯ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, ৮ বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি জানান, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা কর্মসূচি হয়নি। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকার আওতার বাইরে ছিল, তারাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগে কাজ করা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনা জটিলতায় ঘাটতি ছিল। তবে শিশু হামের টিকা নিতে এসে কেন্দ্র থেকে ফেরত যায়নি। ১ এপ্রিল বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘এখন দেওয়ার মতো টিকা নেই’ বলার পর ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে ক্যাচ-আপ টিকাদান শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পর্যাপ্ত হামের টিকা মজুত থাকায় এত স্বল্প সময়ের মধ্যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে পেরেছে সরকার।
মাঠপর্যায়ে টিকা প্রদান করেন স্বাস্থ্য সহকারীরা। আওয়ামী লীগ আমলে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত দাবি করে স্বাস্থ্য সহকারীরা ২০২৫ সালে বেতন-গ্রেড বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তারা শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিকেও জিম্মি করে। তখন সময়ে মাঠ পর্যায়ে টিকা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে বলে জানা যায়।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বর্তমানে শনাক্তকৃত হামের রোগীদের মধ্যে ৩৪ থেকে ৬০ ভাগের বয়স ৯ মাসের কম, যা উদ্বেগের বিষয়। শরীরে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেসহোল্ড অর্জিত না হওয়ায় হাম হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে মায়েদের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে যথেষ্ট ইমিউনিটি ট্রান্সফার না হওয়া এবং অপুষ্টি ও ভিটামিন ঘাটতি থেকেও ৯ মাসের কম বয়সি শিশু আক্রান্ত হয়েছে বলে মনে করেন তারা। এদিকে দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘মহামারি’ হিসাবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)’ ‘হামে শিশুমৃত্যু : জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় এ দাবি জানানো হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কোনো রোগের বিস্তার যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন সেটি ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে’ পরিণত হয়। বর্তমান সরকার এরই মধ্যে চিকিৎসকদের ছুটি বাতিলসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতিকে জরুরি হিসাবে ঘোষণা করা হয়নি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, হাম দ্রুত ছড়ায়। টিকা দেওয়ার পর কার্যকারিতা পেতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ জরুরি। তিনি বলেন, আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক। মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক শিশু। হাম রোধে নীতিগত সুপারিশ হিসাবে পুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’ কার্যক্রম জোরদার, অপুষ্ট শিশুদের অগ্রাধিকার, মাতৃদুগ্ধপান উৎসাহিত করা, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং হাম নির্মূল কৌশলপত্র পুনরুজ্জীবন জরুরি। এছাড়া টিকার সরবরাহ ও উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কাজ করতে হবে।
আরও চারজনের মৃত্যু : শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে ৮৬ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৯৪২ জন আক্রান্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৪০৯ জন। এ সময় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ২৭৮ জন। হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৫২২ জন। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৩৫ এবং সন্দেহজনক হামে ১৭৮ জনের জনের মৃত্যু হয়েছে।